মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২০

খেয়ালী



কতকাল পার হল,কত চন্দ্র ক্ষয়ে ক্ষয়ে হল নিঃশেষ,
কত অভিমান ভাঙ্গালো জোনাকির আলো নিরব রাতের
কত কাশফুল হেসে হল কুটিকুটি এই খরার দেশে।
তবু তোমার দেখা পেলাম না কোন সমাপ্তির শেষে
যেমন করে মেঘের সাথে মেঘের দেখা হয়,
আলোর সাথে এ পৃথিবীর, তেমন করেই চেয়েছি তোমায়
কোন রূপক রাজ্যে লুকিয়ে রেখেছো নিজেকে?
পৃথিবীর বয়স বাড়ছে সাথে তানপুরাটার,
একবার সুর থেমে গেলে হবে না দেখা আর।

বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

শেষের কয়েকটা দিন


আমার ফ্লাইট ৩০ তারিখ । হাতে আছে মাত্র ১২ দিন। তিন মাস ধরে বাড়িতে বসে আছি। গঠনমূলক কাজের মধ্যে একমাত্র জার্মান ভাষা শেখা ছাড়া কিছু করিনা। তাও যদি মন চায় তখন ইউটিউব খুলে আনিয়া(Anja) আপার সাথে মুখ বুলাই - ইশ বিন রব্বানী, ইশ কম্মে আউচ বাংলাদেশ। আর মন না চাইলে মুভি দেখি, বই পড়ি, অথবা ছাদে পাখিদের সাথে কিছুটা সময় কাটাই। জার্মান ভিসা পেয়ে গেছি সুতরাং আমি এখন সাক্সেস্ফুল পাইয়োনিয়ার টাইপ তাই প্রতিদিন কাউকে না কাউকে কাউন্সেলিং করতে হয়। কখনও ফোনে কখনও মেসেঞ্জারে আবার কখনো ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে। "-ভাই ক্যাম্নে এপ্লাই করব? - কত টাকা লাগবে? - আপনি তো ভাই বস" এই টাইপ কথাবার্তার সমাধান দিতে হয় দিনের কোন একটা সময়। কাছের লোকজন ফোন দিলে আগে বলবে কবে ফ্লাইট তারপর অন্য কথা। ভার্সিটির অনেক জুনিওর, সহপাঠী, বড়ভাই কাছের এবং দূরের মেসেঞ্জারে নক দিয়ে খোঁজ খবর নেয়। তারপর সবাই একটা সময়ে জানতে চায় কিভাবে যাওয়া যাবে? আমাদের দেশে বাইরে পড়তে যাওয়া মানেই সাক্সেসফুল হওয়া মনে হয়। ওখানে গিয়ে কিভাবে থাকব, পাস করতে পারব কিনা তার ধার কেউ ধারেনা। সবসময়  বাড়িতে থাকার দরুণ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া হচ্ছে রেগুলার। সেই সুবাদে আঙ্কেল দের সাথেও একটা ভাব হয়ে গেছে। কিছু আংকেল যখনি দেখা হয় তখনি খোজখবর করেন। গোছগাছ কতদূর শুনতে চান। আমি বলি গোছগাছ মুটামুটি হয়ে গেছে বাকিটা যাওয়ার আগে ঢাকা থেকে করতে হবে। জার্মানি সম্পর্কে অনেকে শুনতে চান। কেমন দেশ? ধর্ম কর্ম পালন করা যায় নাকি? কি খাবার খেতে হবে? এক আংকেল একদিন হুট করে বলল "বাবা বাথরুমে কিন্তু ওরা পানি নেয় না। একটা বদনা নিয়ে যাইয়ো।" বদনার বিষয়টা আগে থেকেই জানতাম। তাই  আংকেল কে আস্বস্ত করলাম যে কেনা হয়ে গেছে। আত্নীয় স্বজনদের সাথে দেখা হচ্ছে । আমি জার্মানী যাব এইজন্য কাছের আত্নীয়রা দাওয়াত করে খাওয়াচ্ছেন। দাদী নানীরা মুখে কপালে চুমু খান। কাঁদেন। ভাবেন এইদেখায়  বুঝি শেষ দেখা তাদের সাথে। সব আত্নীয়দের সাথী মুটামুটি সাক্ষাত হয়ে গেছে। ঈদে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম তখন গ্রামের লোকজনদের সাথেও দেখা হয়েছে। আমার বিদেশে পড়তে যাওয়া গ্রামের লোকজন ভালভাবে নিতে পারেনি। অনেকে বলেছে  একটাই ছেলে এতদূর যাওয়ার কি দরকার। এই কথা শুনতে শুনতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি কেন যাচ্ছি শুধু আমিই জানি। সবার জীবনদর্শন এক নয়। কঠোর মনোবল আছে বলেই হয়ত এই প্রশ্নে এখন বিচলিত হইনা। প্রথম দিকে ভাবতাম আমি কি ঠিক করছি? এখন আর এমন ভাবনা মাথায় আসেনা। এখন মনে হয় যে প্রশ্ন করছে তার সাথে আমার জীবনদর্শন আলাদা। সে তার অবস্থান থেকে আমাকে বিবেচনা করছে। আমাকে আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে। অনেকে বলেছে আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া বাদ দিয়ে জার্মানী কেন যাচ্ছি। তাদেরকে ও আমি বেশি কিছু বলিনা। প্রসঙ্গ পাল্টাই। বাসায় চলে আসি। বাসায় আমার মা পরম যত্নে আমাকে প্রতি বেলা খাওয়ান। বাড়ীর বাইরে থাকছি সাত বছর হল। বাসায় এসে এক সপ্তাহের বেশি খুব কমই থাকা হয়েছে। সেই সময়ের মধ্যে মা আমার মন ভরে আমাকে খাওয়াতে পারেন না। মা যত পদের রান্না জানেন তার প্রতিটা আইটেম এক এক করে পূর্ণ স্বাদ পেতে হলে মিনিমাম একমাস বাসায় থাকতে হবে। টাকি মাছ ভর্তা, শুটকি চচ্চরি, সজিনা মাছ করলার ঝোল, করলা আলু শিং মাছের ঝোল, ইলিশ ভুনা, খাসির কোরমা, নেহারী, জিগরি(গরুর ভুড়ি), হরেক রকমের শাক ভাজি, পটল আলু ভেজে ভর্তা, নারকেল দিয়ে হাস, দেশী মুরগীর ঝোল, মিষ্টি কুমড়া দিয়ে গরু, ওল দিয়ে খাসি, মলা মাছের চচ্চরি, বেগুন ভাজি, ডাল আলু ঘন্ট, বুটের ডাল,কাচ্চি, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচু শাক, আলুর দম, কাঠালের বিচি দিয়ে ছোলা চচ্চরি সহ আরো শখানেক আইটেম শুধু মা'র হাতেই অমৃত লাগে। অনেক যায়গায় এগুলো খেয়েছি। পেট ভরলেও মন ভরে না। এখন আমি মন ভরে খাচ্ছি। তিনবেলা ভাত খাচ্ছি। কয়েকদিন আগেও ডায়েট করছিলাম। এখন ভাবি এই খাবার গুলো তো আর পাবনা। যখন পাবনা তখন আবার ডায়েট শুরু করা যাবে। বাসায় শুধু আমি আর ছোটবোন সাদিয়া থাকি। দুই বোন মাঝে মাঝে আসে শশুর বাড়ী থেকে। চারজন একসাথে থাকলে বাড়িতে চাঁদের হাট বসে। বড় আপুর দুইটা ছেলে। বড় ছেলের বয়স সাত। আমার রুমে মাঝে মাঝে ঢু মেরে যায়। আমি ওকে বলেছি জার্মান থেকে তোমার জন্য জার্মান শেফার্ড এনে দিব। আলোচনার অধিকাংশ অংশ জুরে থাকে এই জার্মান শেফার্ড নিয়ে পর্যালোচনা। কত বড়? আমি যা বলব তাই শুনবে নাকি? স্কুলে নিয়ে যেতে পারব নাকি? আমি পিঠের ওপর চরতে পারব নাকি? এইসব হাজারটা প্রশ্ন। তারপর তারা চলে যায় । আমি, সাদিয়া ,মা আর বাবা থাকি বাসায়। রাতে একসাথে খেতে বসি। বাবা বলেন এটা কিনেছি কিনা? ওটা কিনেছি কিনা? লুঙ্গি কয়টা নিবা? যাওয়ার সময় কত টাকা সাথে নিব? রাতে একটা মুভি দেখে ঘুমুতে যাই। অনেক সময় মুভি দেখতে দেখতেই ঘুম চলে আসে আবার মাঝে মাঝে ঘুম হারিয়ে যায়। যেদিন বিকেলে ঘুমাই সেদিন রাতে ঘুম আসতে এই সমস্যা হয়। রাত গভীর হলে আজে বাজে চিন্তা মাথায় আসে। একা লাগে। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন একা হয়ে যাচ্ছি। মন শক্ত করি। ভাবি এখন সবার মাঝে থেকেও একা লাগলে যখন কেউ থাকবেনা তখন কিভাবে বাঁচব। রাত গভীর হয়। একসময় ফুরিয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরি। আর এগারোটা রাত এভাবেই ঘুমিয়ে জেগে কাটাতে হবে। অসংখ্য ভালবাসায় সিক্ত হয়ে, ভাল লাগার না লাগার হাজারো স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে শেষের কয়টা দিনও শেষ হয়ে যাবে।    

শুক্রবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সূর্যাস্তে একদিন


একটা মানুষ জীবনে কতগুলো সূর্যাস্ত পায়?যতগুলো দিন সে পৃথিবীতে অতিবাহিত করে?না মানুষ প্রতিদিন সূর্যাস্ত পায় না।নিত্য নৈমত্যিক ঘটে যাওয়া অনেক জিনিসই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।কোন এক বিস্তৃত স্থির সময়ে নিত্য ঘটে যাওয়া জিনিস গুলো অন্যভাবে আমাদের চোখে ধরা পরে।সব সূর্যাস্ত সমান আভা বিস্তার করে না সবসময়।সমান ভাবে হলুদাভ আলোই রাঙ্গায় না চারপাশ।আলোরিত করে না অতীত কে।আজ ফাল্গুনের এক বিস্তৃত সূর্যাস্তে হয়ত অনেকেই বদ্ধ ঘরে টিভি সেটের সামনে নিজের প্রিয় প্রোগ্রাম দেখতে মশগুল।কেউ ঘুমে কাটায় অথবা সূর্যাস্তের দিকে ভ্রুক্ষেপ ও করে না।আজকের সূর্যাস্ত কিন্তু আমার কাছে আলাদা।সারাদিন ক্লাস আর টিউশনিতে দৌড়াদৌড়ির পর ক্লান্ত পায়ে সাইকেল ঠেলে যখন বাসায় ফিরছি,বাড়ির কাছের একটা সাকোতে উঠে নিজেকে জিড়িয়ে নেবার জন্য যখন একটু  সাইকেল থামিয়ে পশ্চিম আকাশে তাকাই,একি,ছোট একটা নদীর সীমানায় বিশাল আকাশ আজ অন্যভাবে সেজেছে যেন।সূর্যমামা তার নিজের লাল আভা ছিটিয়ে দিচ্ছে সারা আকাশ ময়।লোহিত সাগর আজ অস্ত আকাশে উঠে এসেছে।আর সেই সাগরের লাল পানির সুচারু ধারা যেন এই ছোট নদী বেয়ে সাকোর নিচ দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূরে। সাথে আমিও দৃষ্টি হারিয়ে চলেছি সূর্যের ওপাশে।একদৃশটিতে তাকিয়ে থাকতে চোখে নেশা ধরে গেল।নিজেকে হারিয়ে ফেললাম আকাশের কিনারে।কোন কিছু ভাবতে আর ভাল লাগছে না।সারাদিনের ক্লান্তি কোথায় হারিয়ে গেল।সারা আকাশ যেন আমার আজ।আমার জীবনকে তুলে ধরেছে বিশ্বের কাছে।আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি আমার কৃত সমস্ত কাজ।আমার অতীত।আমার বিরহ।আমার আনন্দ।সেই আকাশ ময় কিছু পাখির ঝাঁক উড়ে উড়ে যেন পাতা উল্টিয়ে দিচ্ছে আমার  জীবন ডায়েরীর।আমি পড়ে চলেছি।আমার জীবনকে আমি পড়ছি।ঠোটের ফাঁকে কখনো জমছে হাসি আবার কোন এক পাগলামীর ক্ষুদ্র মুহুর্তে চোখের কিনারে জমা হচ্ছে জলবিন্দু।গড়িয়ে পরবার আগেই অন্য এক রঙ চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে যায়।চোখে পলক পরে।দেখি,পড়ি, ফিরে যাই।বড় আপুর সাথে আমার সেই শৈশব,কথা তখনও ঠিক ফোটেনি।আপু আমার সাথে পৃথিবীর পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।“বাবু ওইটা কি বলত”।আপুকে খুশি করার জন্য বলছি কিছু একটা।সেটা শুনেই আপু হেসে জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে গালে। উৎসাহে বারবার বলছি।আপুর সাথে সারাদিন ছোটাছুটি।নতুন নতুন খেলা।বাল্যকালের সেই ছোটমঞ্চে আপু অভিনেত্রী আর আমিই তার প্রধান দর্শক।আমাকে খুশি করার জন্যও তার কত বিশেষ কাজ ছিল।আপু আমার থেকে বড় হলেও আমার উপযোগী করে খেলা বানিয়ে নিত।আমার সাথে কত মজা করে খেলত।পরে কতবার আপুর সেই অনর্থক কাজগুলোর জন্য করুনায় নাকি ভালবাসায় চোখ ভিজে উঠেছে।আপুকে আমি জীবনে কিছু দিতে পারলাম না এমন ভেবেও নিজেকে কতবার অপদার্থ মনে হয়েছে। তারপর আমার হারিয়ে যাওয়ার দিনটা চোখে পরল।আমার পৃথিবী অনেক ছোট।বাড়ি আর বাড়ির সামনে মাঠটা।আমি আর ইদ্রিস ঐ মাঠে প্রতিদিন ঘুড়ি উড়োতাম।সারাদিন টো টো করে মাঠময় ঘুরতাম।ইদ্রিস ঘুরির লাটাই ধরে থাকত।সেই কালো চেহারার ছোট মানুষ ইদ্রিস।কখনই তাকে নিজের কোমরের সাথে মানানসই প্যান্ট পড়তে দেখলাম না।কতবার আমার সামনে তার প্যান্ট খুলে পরল।সবসময় তার এক হাত বন্ধ থাকত প্যান্ট ধরে থাকার কাজে।বৈশাখের কোন এক কাল বৈশাখী ঝরে আমাদের ঘড়ির সুতো ছিড়ে গেল।ইদ্রিসের সেই গলা ফাটানো চিৎকার”সুতা ছিড়ছে রে”।ঘুড়ির পেছন পেছন দৌড়।দৌড়াতে দৌড়াতে আমার পৃথিবীর বাইরে চলে গেলাম।হারিয়ে গেলাম আমি বিশাল পৃথিবীতে।তারপর?তারপর আর একটু বড় হয়েছি।বড় হলে কি হবে মায়ের আচল  ছাড়া অসহায় আমি।বর্ষার একরাতে প্রচন্ড জ্বর উঠল গায়ে।প্রলাপ বকছি।মাথার পাশে মা বসে একটানা পানি ঢালছে।পানি ঢালছে কিন্তু জ্বর নামছে না।তখন মার অবস্থা দেখে কে?কত রাত যে আমার মাথার পাশে বসে মার নির্ঘুম রাত পার হয়েছে তার হিসাব কে রাখবে।মা রা কি এমনই হয়?আহা মা আমার মা।এই পাতাটা মায়ের সেই উষ্ণ আচলের মত কোমল।রংচটা শাড়ির আচলের মত মলিন।বাবার কথা মনে পরে।স্মরণ করার মত কোন ঘটনা না।এতদিন তাই মনেও আসে নি।আজ হটাৎ লাল আকাশের কিনারে বাবার হাসিমাখা খোঁচাদাড়িময় মুখখানা নতুন করে বাবাকে চেনায়।বাবারা এমন কাজ প্রতিনিয়ত করে আমার বাবাও করেছিল।আমাকে মেলায় নিয়ে গিয়েছিল।গোপিনাথপুরের মেলা।সারারাত বাবার সাথে যাত্রা দেখার পর আমি আর হাঁটতে পারছিলাম না।এতবড় ছেলেকে পিঠে করে বাবা কতটা পথ যে হেঁটেছিল আজ সেটা হটাৎ মনে পরল।এতদিন স্বাভাবিক ভাবেই মনের কোন এক কোনায় হারিয়ে গিয়েছিল।আশ্চর্য অস্ত আকাশ এত কিছু জানল কিভাবে?বাবার সেই পিঠ আমাকে যেন এখনও বহন করে চলেছে। মনটা হটাৎ কেমন করে উঠল।চোখ ভরে পানি চলে আসল।চোখ ঝাপ্সা হল।ঝাপ্সা চোখে আরো ভালভাবে দেখতে পাচ্ছি সবকিছু।বাবা তোমাকে ভালবাসি আমি।কখনই বলা হয় নি।হবেও না জানি।তারপর হটাৎ করে দাদি একদিন মারা গেলেন।আমার এখনো মনে হয় না দাদি নেই।দাদির সাথে আমার শৈশবের অনেকটা রঙ্গিন মুহুর্ত কেটেছে।দাদি আমার  প্রথম প্রেমিকা।শৈশবেই যিনি আমাকে প্রেমিক বানিয়েছিলেন তার কতটা সাহচর্যে থাকতে হয়েছিল কত আবেগ তার সাথে ভাগাভাগি করতে হয়েছিল,কত অভিমান,কত কাহিনী রাতের পর রাত,দিনের পর দিন আমাকে মাতিয়ে রেখেছিল তার দায়ভার এই অস্ত আকাশ কখনই নিতে পারবে না।তবে এত বড় আবেগ সে কেন ধারণ করতে গেল।দাদি তো শুধু আমার অতীত না।দাদি আমার সব।কোন কোন বিশেষ কাজ ছিল যেগুলো আমি শুধু দাদির ভাললাগার জন্যই করতাম।আমি ইচ্ছা করেই পেটে ব্যথার ভান করে  দাদির কোলে শুয়ে থাকতাম।আজ দাদি আমার সমস্ত কাজে থাকে।তার সাথে এখনও আমার মান অভিমান হয়।ঘুমের ঘোরে তার সাথে কথা বলি।এখনও মনে হয় বাবা মার সাথে রাগ করে দাদির সাথে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছি।আমি আর অস্ত আকাশে তাকিয়ে থাকতে পারছি না।এই আকাশ আমার খুটিনাটি সব উদ্ধার করে ফেলল।আমি এখান থেকে বেরিয়েও আসতে পারছি না।আমার দৃষ্টি হারিয়ে গেছে আমার আকাশে।আপুর বিয়ের দিন।এই তো কয়েকদিন আগের কথা।আমাদের বাড়ি সাজানো হয়েছিলো রংবেরঙ্গের বাতি দিয়ে।আজ অস্ত আকাশ যেন আমার বোনের সেই বিয়ের আলোকসজ্জায় ধারণ করে আছে।কত ধুম ধাম।আমাদের বাড়ি আত্নীয়সজন দিয়ে ভরে গেল।আমি তাদের অনেককেই চিনিনা।অনেকেই আমাকে দেখেও চিনতে পারে না।আমার মা গর্বের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়।
“আমার ছেলে।ক্লাস সেভেনে পরে।রোল দুই।আকবরের রোল এক,আমার ছেলের থেকে বয়সে কত বড়”
সেই বয়সে কত সুনাম কুরিয়েছি আত্নীয়দের কাছ থেকে।অনেকেই বলে “কত ছোট দেখেছি।এই কয়দিনেই কত বড় হয়েছে ইশিতার ছেলে”।বড় হওয়া যেন একটা বিশাল কাজ তখন আমার এমন ভঙ্গি।এমন কাচুমাচু হয়ে থাকতাম যেন আমার মত ভদ্র ছেলে আর নাই।দাদি গোছের যারা তারা তো কোন কথা বলার আগেই বলত “ছেলের তো বউ দেয়া দরকার”।এই কথা শোনার পর আমার লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যেত।আরেকজন প্রতিবাদ করত “এক চোকরার কয়টা বউ লাগবে।আমি তো আছিই”।আরো কত কথা।বড় আপুর বিয়ে হয়ে গেল।হ্যা আমার শৈশবের সেই খেলার সাথীর বিয়ে হল।আপুর বিদায়ের সময় সবাই কান্নাকাটিতে সারা বাড়ি তোলপাড় শুরু করে দিল।শুধু আমার চোখে কোন পানি নেই।আপু একে একে সবার থেকে বিদায় নিচ্ছে।সবশেষে এল আমার পালা।আপু আমাকে জরিয়ে ধরতেই আমার চোখ ভেসে কোথা থেকে পানি চলে আসল।তখন মনে হচ্ছিল এইত আমাকে ছেড়ে আপু এখন চলে যাবে।আর কখনও আমরা খেলতে পারব না।আমার সেই জীবনের প্রথম খেলার সাথী আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।আপু তখন কানের কাছে আস্তে করে বলল “যাবি বাবু আমার সাথে?”  আমি ততদিনে বুঝে গেছি চাইলেও আমি আপুর সাথে যাইতে পারব না।আপু চাইলেও আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না।সব বিদায়ের চিত্র দেখতে দেখতে সূর্যেরও বিদায় হয়ে গেল।আকাশের লালিমা আস্তে আস্তে হালকা হতে থাকল।সূর্য অস্ত গেলেও তার আভা আরো এক অবশিষ্ঠ জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।সূর্যের অনুপস্থিতিতে তার যে হলুদাভ আভা সারা আকাশময় বিরাজ থাকে।আমাদের জীবনেও সূর্যের মত কারো আবির্ভাব হয়।তার উজ্জ্বল আলোয় আমাদের জীবনও প্লাবিত হতে থাকে।সেই সূর্য অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে তার আভাও আমাদের জীবনময় বিরাজ করে।সেই আভা বহন করতে করতে আমাদের জীবনও অস্তমিত সূর্যের মত শেষ হয়ে আসে।দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় নিজের কথা মনে হয়।চারপাশে অন্ধকার হয়ে আসছে।বাসায় ফিরতে হবে।শেষ পাতা এখনও পড়া হয় নি।আলো কমিয়ে আসছে।শেষ পাতাটা ঝাপ্সা হয়ে আসছে।মেয়েটা আমার সাথে কেন এমন করল।আমার তো কোন দোষ ছিল না।সূর্যের আলো যেভাবে ধারণ করতে হয় আমিও সেভাবেই ধারণ করেছি। আমি তো তার বিন্দু মাত্র ত্রুটি করি নাই।আমিও তাকে ভালবেসেছি।কোন খাদ ছিল না।সেই গভীর চোখ,হাওয়ায় উড়ন্ত চুল,তার ক্ষুদ্র কথাবার্তা আমার জীবনকে মুহুর্তেই আলোকিত করে তুলেছিল।আমি তো তার প্রেমে পরেছিলাম।আমার আকাশজুড়ে তার মুক্ত বিচরণ ছিল।ঐ সূর্যের মতই।আমিও আকাশ পেতে তার আলোর পানে চেয়ে থেকেছি।কোন মেঘের আবির্ভাব সহ্য করিনি।সহজ কথায়,সহজ চলনে আমি হারিয়ে যেতাম।আমার জীবনটাকে পরিবর্তন করেছিল আমার সেই সূর্য।আমি বাঁচতে শিখেছি,জীবনের মানে শিখেছি তার কাছে।অথচ সেই আমার সমস্ত জীবনের অর্থ পাল্টে দিল।সে অস্ত গিয়ে আমার আকাশ কে গাঢ়ো হলুদাভ আভায় ভাসিয়ে দিল।তার অনুপস্থিতেও এই হলুদাভ রেখা আমার আকাশ ময় বিরাজ করে।আমার পূর্ব পশ্চিমময় এক সুদীর্ঘ রেখা টেনে আমাকে আবদ্ধ করে রাখে।আমি এখন হাসতে পারি না।আমি এর কোন মানে পাই না।হয়ত ব্যর্থতা।অথবা অন্যকিছু।এক নিগূঢ় অপমানে আমি ভেতরে মুষরে পরি।
চারপাশে এখন ঘোর অন্ধকার।আমি সাইকেল এ আমার দৃঢ় পায়ে ঠেস দিয়ে চলেছি।একটু আগের সেই সূর্যাস্তের কোন চিহ্ন নেই চারপাশে।কেউ জানবেনা আজকের এই সূর্যাস্ত আমার জীবনকে কতটা নাড়া দিয়েছে।একসাথে সমগ্র জীবন ডায়েরী কোন সূর্যাস্ত তুলে ধরেনি আগে।আমি আমার সমগ্র জীবনকে এখনও দেখতে পাচ্ছি যেন।অন্ধকারের ভেতর আমার সাইকেল এক ঘোরে অগ্রসর হচ্ছে সাথে আমিও।আমার এই ঘোর কাটতে আগামীকালের নতুন সূর্যের খুব প্রয়োজন।

০৬।০৩।১৪, রাজশাহী

কাবাব পার্টি


কাবাব পার্টি করার ইচ্ছা আমাদের অনেকদিনের।বন্ধুদের মধ্যে এরকম আরো কিছু ইচ্ছা সারাবছর গল্পের অনেকটা অংশ জুড়ে থাকে।বন্ধুরা সবাই একসাথে হলে যেগুলোর কেবল প্লানই হয়।বাস্তবায়ন হয় না।কাবাব পার্টি করা এরকম আমাদের একটা অনেক আকাঙ্খিত শখ।বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে সবার আর্থিক সঙ্কটই মুখ্য।তাই কয়েকদিন আগে প্লান হল কোন টাকা ছাড়া কিভাবে কাবাব পার্টি করা যায়।টাকা ছাড়া কাজ হবে আর মুকুলের শরনাপন্ন হব না এমনটা কখনই হতে পারে না।তার মাথায় সবসময় কিছু প্লান রেডি করা থাকে টাকা বাচানোর বিকল্প পথ হিসেবে।তার প্লান গুলো অভিনব।মাসের শেষে যখন আমার পকেটে টাকা থাকে না তখন মুকুল এর সাথে হোটেলে যাই তরকারি কিনতে দুজন মিলে হাফ করে ভাগাভাগি করে নিয়ে হলের ক্যান্টিনে বসে আরামচে উদরপুর্তি করি  আনলিমিটেড ভাতে।মাসের শেষে সিগারেট কেনার টাকা না থাকলে সারা মাস ধরে জমানো সিগারেটের পশ্চাৎদেশের স্বাদ আহরণও তার কাছ থেকেই শিখেছি।মুকুল যেন এক আশার নাম।এবারো আমাদের নিরাশ করল না মুকুল।তার কাছ থেকে দুইটা প্লান পাওয়া গেল।প্রথম প্লানটা হল এলাকার বড় ভাইদের সাথে নিয়ে করা।তাতে করে খরচটা তাদের ওপর দিয়েই যাবে আমাদের শুধু পরিশ্রম।প্লানটা কারো পছন্দ হল না।আমাদের পার্টিতে বড়ভাই দের রাখব কেন? তার দ্বিতীয় প্লান হচ্ছে আগামী কুরবানী ঈদে কাবাব পার্টিখন আলাদা করে গোস্ত কিনতে হবে না।সবার বাসাতেই গোস্ত থাকবে শুধু বানানোর কৌশল টা জানার বিষয়।সেদিক থেকেও আস্বস্ত করল মুকুল।সে নাকি চেস্টা করলেই কাবাব বানিয়ে ফেলতে পারে।একবার চেস্টা করে খিচুরি রান্না করে অনেক প্রশংসা কামিয়েছিল।
-আরে ধুর কুরবানী আসতে আরো কম করে হলেও পাঁচ মাস বাকি।এতদিন দেরী করা যায় নাকি।
হটাৎ করে আলেক প্রতিবাদ জানায় মুকুলের প্রস্তাবে।
-দুই বছর ধরে তো শুধু প্লানই করে যাচ্ছিস।করতে পেরেছিস আজো?পাঁচ মাসে আর কি হবে যদি করতে পারি কি বলিস রাকু?
রাকু আমাদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্যোগী ছেলে।সে বারবার সবাই কে উৎসাহিত করতে করতে এখন নিজেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।সে ধরে নিয়েছে এটাও প্রতিদিনের মত নিছক একটা প্লান ছাড়া কিছু নয়।মিনমিনে কন্ঠে তাই সে জানায় “ঠিকই তো”এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।মোটামুটি একটা সিদ্ধান্তে পৌছে সবকিছু সেদিনের জন্য সমাপ্ত হল।দীর্ঘ পাঁচ মাস পরে সেই কাঙ্খিত দিনটি আসল।সবার ঘরে ঘরে কুরবানী জবাই হলগোস্তের অভাব নেই। পাঁচ মাসের বিরতিতে কাঙ্খিত অনেক জিনিসই অনাকাঙ্খিত হয়ে ওঠে।অনেক প্রিয় জিনিস হয়ে ওঠে অপ্রিয়।নিত্য আলোচ্য বিষয় চাপা পরে যায় নতুন ঘটনায়। সবাই মনে হয় তাই ভুলতে বসেছিল আমাদের সেই কাঙ্খিত কাবাব পার্টির কথা কিন্তু রাকু ভোলার পাত্র নয়।ঈদের দিন বিকেলে ওর সাথে দেখা হতেই কাবাব পার্টির কথা আবার ও তুলল। এবার ও সত্যি সত্যিই করে ফেলবে কাবাব পার্টি।কেউ না করলে একা বাসার ছাদে করবে এমনটা হুমকিও দিতে থাকে।তাই তাকে আস্বস্ত করা হল আগামী কালই করা হবে আমাদের কাবাব পার্টি।রাজুদের গ্রামের বাসায়।রাজু আমাদের আরেকজন বন্ধুবর।গম্ভীর প্রকৃতির।আগেও নাই পাছেও নাই।সবকিছুর মাঝখানে তার ভুমিকা।উৎসাহ নাই নিরুৎসাহও নাই।বল্লে করবে না বললে করবেনা এমন প্রকৃতির।তবে সে সাথে থাকলে একটা অন্য মাত্রা যোগ হয় বন্ধুদের আড্ডায়।গল্প বলায় পটু।সাধারণ গল্প অসাধারণ করে উপস্থাপন করতে রাজুর দ্বিতীয় কেউ নেই।হাঁটতে হাঁটতে সেন্ডেল ছিঁড়ে গেল তো গার্ল ফ্রেন্ডকে ফোন দিয়ে গালি শুরু।অকথ্য ভাষায় গালি।
-তোরে আমি আমার ছেড়া সেন্ডেল দিয়ে থাপরাবো হারামজাদী।
ওপাশ থেকে শান্ত কন্ঠ
-তোমার সেন্ডেল বুঝি ছিঁড়ে গেছে।তো ঠিক করে নিলেই হয় বাবু।
তখন আমাদের হাসি আর থামায় কে।আমাদের হাসিতে রাজু আবার গালিগালাজ শুরু করে।সবার আগে ও ছুটিতে আসে।ভার্সিটি ছুটি হবার আগেই।তারপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।তার গ্রামের বাসা খুজে বের করার দায়িত্ব নেয় আলেক।আলেক ওর স্কুলফ্রেন্ড।স্কুলে থাকতে প্রথম পরিচয়ে আলেকের ডায়েরিতে ওর গ্রামের বাসার ঠিকানা লিখে দিয়েছিল।পুরোনো দিনের ডায়েরী খুঁজে পাওয়া মুশকিল।তবে আলেক ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়।অনেক খোঁজাখুঁজির পর তার দাদীর পুরনো চৌকির নিচে ডায়েরীর অস্তিত্ব আবিষ্কার করে।সেখানে স্পষ্ট  রাজুর লেখা-
নামঃ মোঃ আসিফুজ্জামান রাজু
পিতার নামঃ মোঃ তারেক হাসান
মাতার নামঃ মোছাঃআছিয়া খাতুন
গ্রামঃপালিকান্দা,পোস্টঃসিহালীহাট,থানাঃশিবগঞ্জ,জেলাঃবগুড়া
রাজধানীঃঢাকা,বাংলাদেশ।
পেন্সিল দিয়ে মোটা মোটা লেখা।সেটাই ছিঁড়ে পকেটে গুজে রাখে আলেক।
অইদিন আর কোন প্লান হয় না।পরেরদিন  বিকেলে সবার বাসা থেকে এক কেজি করে গোস্ত নিয়ে রওনা হলাম রাজুর গ্রামের বাড়ির উদ্দ্যেশ্যে।সি এন জি অটোরিক্সা ভাড়া করা হল।রিজার্ভ।সবাই অনেক খুশি শুধু মুকুল বাদে।ওটোরিক্সা ভাড়া তার কাছে বেশি মনে হয়েছে।সে দুই তিনবার সেটা বলেছে।কেউ তার কথায় কান দেয় নি।হলে হয়েছে।প্রতিদিন তো আর যাচ্ছিনাসূর্যাস্তের বেশি দেরি নেই।আকাশ লাল হতে শুরু করেছে।চারপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু বিস্তৃত মাঠ আর মাঠদূরে অচেনা গ্রামগুলো আবছা ছবির মত লাগে।তারি মাঝখান দিয়ে অচেনা পথে  ছুটে চলেছে সি এন জি অটোরিক্সা।গতি বেশি নয় আবার ধীরও নয়।মৃদুমন্দ হাওয়া এসে লাগছে গায়ে।একটু শীত শীত হাওয়া।অন্যরকম এক রাজ্যের ছবি চোখে ভাসছে সবার।এরকম অনেকদিন বাইরে বের হওয়া হয় না সবাই মিলে।জড়তা থেকে মুক্তির একটা স্বাদ।সবাই চুপচাপ।শুধু মুকুল গুনগুন করে কি যেন গান গেয়ে যাচ্ছে।নিরবতা ভেঙ্গে হটাৎ রাকু বলল
-রাজু তো জানে না আমরা তার গ্রামের বাসায় যাচ্ছি।একটা সারপ্রাইজ এর মত হবে তাইনা?
মুকুল গান থামিয়ে বলে সারপ্রাইজ না বাল হবে।ও বেটা  আমাদের গোস্ত দিয়ে রেজালা করে আমাদের  খাওয়াবে।কাবাব পার্টি করতে পারিস নাকি সেটা আগে দেখ।
রাকু-যদি না করতে দেয় আমরাও কি ছাড়ব নাকি?জুতো মারব শালার গালে।
আলেক-তারপর রাতে থাকবি কোথায়?তোর কাপড় যদি রাতে লুকিয়ে রাখে পরেরদিন তো নেংটো হয়ে বাসায় আসতে হবে।
রাকু-ভাল কথা বলেছিস।শালা যে ধুরন্দর সবকিছু করতে পারে।
কথা বলতে বলতে আমরা সেই পালিকান্দা গ্রামে পৌছলাম সন্ধ্যার পরে।মুকুল আগে নেমেই একটা লোকের সাথে কথা বলতে শুরু করল।পরে জানতে পারলাম লোকটা রাজুর বাবা।মুকুল আগে দেখেছে রাজুর সাথে।ভাড়াটা রাজুর বাবা পরিশোধ করবে আমরা তাই ধরে নিয়েছিলাম।কিন্তু একি বেটা কা বাপ।
ভাড়া তো দূরের কথা আমাদের দিলেন এক ঝাড়ি।
তোমাদের বাবা মা কিছু বলে না?বাসা থেকে এতদূর চলে আসছ।তাও রাতে থাকবে।বাসায় জানিয়ে এসেছ নাকি না জানিয়ে।
আমরা সবাই জানিয়ে এসেছিলাম শুধু আলেক না জানিয়ে এসেছে।ও বলেছে আমার বাসার কথা।আমার বাসা ওর বাসার পাশেই।তাই ও কিছুটা চুপসে গেল।তবে মুখে আমাদের সবারই হাসি।মনে মনে ভাবছি আল্লাহ রেহায় দাও।
আঙ্কেল ও ছেড়ে দেবার পাত্র নন।ঝাড়ি দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হলেন না।গ্রামে থাকার কিছু নিয়ম কানুন শিখে দিলেনযেমন সবাইকে লুঙ্গি পরতে হবে।সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মাঠের ঠান্ডা হাওয়া লাগাতে হবে।ইত্যাদি।
আঙ্কেল এর কাছ থেকে রেহায় পেয়ে আমরা পরলাম রাজুর হাতে।ওর অন্য মুর্তি।ওকি আমাদের বন্ধু রাজু নাকি রাজুর জমজ।আমাদের প্রথম দেখে চিনতেই পারল না যেনতারপর একটু দম নিয়ে
আমার গ্রামের বাসার খোঁজ তোদের কে দিল?
আলেক সাথে সাথে পকেট থেকে তার ছেঁড়া ডায়েরীর পাতা এই ভেবে বেড় করে দেখাল যেন রাজু খুশি হয় ছোটবেলার স্মৃতি মনে পরে।তবে কাজ হল উল্টা।রাজু খুশি হওয়া তো দূরের কথা আলেককে গালি দিতে শুরু করে দিল।
-শালা কোনদিন কে কোথায় কি লিখে রাখছে সেটা যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছিস।পাপ করেছি আমি ওটা তোর ডায়েরিতে লিখে এবার আমায় ক্ষমা কর। 
 তারপর মুকুলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে
-তুই কেন আসছিস বে?কিপ্টে কোথাকার।ঝোলায় আবার কি এনেছিস।
আলেক মুকুল দুজনেই চুপসে গেল।
পরে তাকে সবাই মিলে বুঝানো হল ঝোলায় আর কিছু নয় কুরবানীর মাংস। আমাদের অনেকদিনের কাবাব পার্টি করার ইচ্ছা আজ এখানে সম্পন্ন করতে এসেছিতার যদি সম্মতি থাকে।
-সম্মতি কি বে?এসেই পরেছিস এখন না করলে তো বদনাম গাবি আমার নামে।
রাকু বিরবির করে কি যেন বলল।আমি তার পাশে থাকায় কিছুটা বুঝলাম যার মানে এরকম
-বদনাম গাওয়ার মত আর বাকি রাখলি কি তুই আর তোর বাপ?
ভাগ্যিস রাজু শোনে নি।শুনলে হয়ত রাকু কাল সত্যি সত্যিই নেংটো হয়ে বাসায় ফিরত।কিছুক্ষণ পর আগের রাজুকে আমরা ফিরে পেলাম।আমাদের আড্ডার মদ্যমণি রাজু।কোন কথায় যার মুখে বাধে না।কোন গল্পই যার অজানা নয়।রাজু কাবাব বানানোর সমস্ত ব্যবস্থা করল।রাজুর মা নেই।ওর জন্মের কিছুদিন পরেই উনি মারা যান।মা ছাড়া একটা সংসার কিভাবে চলতে পারে সেটা দেখার বিষয়।সংসারের সবকিছু পুরুষালী কায়দায় গোছানো।যেটা যেখানে যখন দরকার সেটা সেখানেই পরে থাকে।সোফায় হয়ত পাতিল রাখা,বাটি বলে কোন জিনিস দেখতে পেলাম না।যেই পাত্রে রান্না হয় সেখান থেকেই খাওয়া।সবকিছু অপরিষ্কার।দরকারী জিনিস হাতের কাছে না থাকলে যেটা পাওয়া যায় সেটা দিয়েই কাজ সারা হয়।এভাবে মধ্যরাত পর্যন্ত চলল কাবাব পার্টির যোগার।মুকুল এর কথা মত মাংস ফালা ফালা করা হল।তার পর মশলা মিশিয়ে লবন পানিতে চুবিয়ে রাখা হল।মাঝরাতে আমরা পাঁচ জন যুবক সবকিছু কাঁধে নিয়ে জ্যোসনায় প্লাবিত মাঠের বুক চিরে হেঁটে চলেছি।কারো কাঁধে মাংসের বড় গামলা।কারো কাঁধে কোদাল আবার কারো কাঁধে আটি বাধা জ্বালানীর কাঠ।মধ্যমাঠে আমরা সবাই সবকিছু নামিয়ে রাখলাম।কার্তিকের রাত।আকাশ থেকে একটা চাঁদ সারা মাঠ আলো ছিটিয়ে দিচ্ছে।আমরা আলো পিপাসু সেই আলো ধারণ করছি অঙ্গে।হিম হয়ে যাওয়ার মত পরিবেশ।চাঁদের আলোকে উপেক্ষা করে রাজু কাঠগুলোতে কেরোসিন ঢেলে আগুনের ফুলকি তৈরি করল।কাবাব বানানোর জন্য কয়লা দরকার সেইজন্যই কাঠ পোড়ানোর ব্যবস্থা।আগুনকে ঘিরে সবাই বসে পরলাম মধ্যমাঠে।তখনও সারা মাঠে ধান।কিছু কিছু জমিতে কাটা হয়েছে।আমরা এরকম একটা জমি বেছে নিয়েছি।চারপাশে পাকা ধানের মো মো করা গন্ধের সাথে চাঁদের অপরুপ আলোয় সারামাঠ কে যেন একটা ছবির ফ্রেমে বেধে রেখেছে।যার মাঝখানে আমরা কয়েকজন আলোর দীশারি।কয়লা পাবার জন্য আগুনের সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে বসে আছি।আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে নেশা লাগে।স্বপ্নের মত মনে হয়।কারো মুখে কোন কথা নাই।নিরবতা ভেঙ্গে গান ধরল রাজু।তার ভড়াট গলায় টানা টানা শুরে আগেও আমরা অনেকবার মুগ্ধ হয়েছি।আজ বিমোহিত হলাম
“সখী চাঁদরাতে যদি তোমার ব্যথা জাগে মনে
কইয়ো গোপনে।
আমি তোমার ব্যথার ভাগিদার”
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কয়লা জমে গেছে আগুনের নিচে।রাকু একটা কাঠ দিয়ে সেগুলো টেনে টেনে স্তুপ করল।মুকুল তার কাবাব বানানোর নেট বের করে তার কৌশল প্রয়োগ করল।মাংস যখন পুড়ে একটা আলাদা গন্ধে মাতিয়ে তুলছে চারিদিক তখন আবিষ্কার করলাম আমাদের ক্ষুদা।রাতে কিছু খাওয়া হয় নাই।এখন মাঝরাত।পেটের মধ্যে হটাৎ চো চো করে উঠল।সবাই তাই আধা হওয়া কাবাবই মুখে পুরতে শুরু করে দিল।আমি একটা তুলে মুখে পুরতেই বুক থেকে গলা পর্যন্ত তেতো হয়ে গেল।লবন অতিরিক্ত পরেছে।সবাই সবার মুখ চাওয়া চাওই হল।মুকুল শুধু মুখ নিচের দিকে।একটু চুপ করে থেকে মাঠের মাঝখান দিয়ে দিল এক দৌড়।সে ততক্ষণে বুঝে গেছে আমরা তাকে ছাড়ছি না। তার পেছন পেছন আমরা সবাই দৌড়।ও বারবার বলে আসছিল চেস্টা করলেই ও কাবাব বানাতে পারবে।আমরা সবাই ওর ওপরেই আস্বস্ত ছিলাম।শেষে গুরেবালি।রাজু মাংসগুলো ধুয়ে আবার নতুন করে কাবাব বানাতে লেগে গেল।তাও কিছু হল না।যা নোনতা সেটাই থেকে গেল।দুই বার তিনবার ধোয়া হল।মশলা সব ধুয়ে গেল তবু মাংসের ভেতরের লবন গেল না।
হতাশ হয়ে রাজু বলে বসল
-শালার লবন কোষে ঢুকে গেছে।কম্প্রেশড করে বের করতে হবে।
আলেক নির্বাক।রাকু চোখ গরম করে বিরবির করে যাচ্ছে।আমার পেট আর বাঁধা মানছে না।মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।করার কিছু নাই।মাংস পুরলেই নোনতা হয়ে যাচ্ছে আর তাছাড়া মশলা সব ধুয়ে গেছে।মাংসের মধ্যে যা আছে তা শুধু লবণ কাবাব বানানোর চেস্টা তাই বৃথা।মুকুলের খবর নাই।মাঠের মধ্যে উধাও।পরিস্থিতি শান্ত হলে মুকুল কোথা থেকে যেন হাজির হাতে একটা কাঁচের বোতল।কারো বুঝতে বাকি রইল না মুকুলের ক্যালমা।সাথে সাথে মুকুলের ওপরে সবাই ঝাপ।কাবাব কি খাব।বোতলে এক চুমুক দিতেই মাথা থেকে সব বের হয়ে গেল।ভাসছি যেন।আলেক প্রথমে খেতে রাজি হয় নি।রাজু ওকে জোর করে খাইয়েছে।রাকু চিৎকার দিয়ে বলে উঠল
-মুকুল তুই আমার সত্যিকার বন্ধু রেআয় আমরা আবার নতুন করে জন্ম নেই।
আলেক টলতে টলতে গান ধরল। “আমি নেংটা ছিলাম ভাল ছিলাম,ভাল ছিল শিশু কাল
                                        .............................................
                                            আমি আবার নেংটা হয়ে যাব”
রাজুর নেংটা হতে বেশি সময় লাগল না।সাথে সাথে মুকুল,আলেক,রাকু,সবাই।পাঁচজন মধ্যমাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে আছি।চাঁদের আলো আমাদের ধুয়ে দিচ্ছে।আমরা পবিত্র হচ্ছি।রাজু আবেগ আপ্লুত কন্ঠে আমাকে বলে বসল
-মইন আমার গার্লফ্রেন্ড কে তুই বিয়ে করিস দোস্ত
আমি ভেবে পাই না।মাতাল হলেও কি এমন প্রস্তাব করা যায়?
-তোর গার্লফ্রন্ড কে আমি বিয়ে করতে যাব কেন।
-করবি মইন।তুই অনেক ভাল ছেলে।আমার সাথে বিয়ে হলে ও সুখে থাকবে না।তুই ওকে সুখে রাখতে পারবি।
আগের বার যখন আমরা মাতাল হই তখন আমি রাজু কে বলেছিলাম
-রাজু তোর গার্লফ্রেন্ডের সাথে আমার বিয়ে দিবি?
সেই কথারই প্রতিফলন আজ আবার।তবে অন্যভাবে।রাজু সিরিয়াস।তার গার্লফ্রেন্ড কে ও ভালবাসে তবে বিয়ে করবে না আমরা সবাই জানি।ব্রেক আপ করার জন্য নানান কৌশল সে প্রতিদিন প্রয়োগ করে।কোন কাজ হয় না।আজ কি বলছে রাজু আমাকে।এও কি সম্ভব?রাজু অদ্ভুত।এতটা অদ্ভুত আগে জানা ছিল না।
কিরে করবি?
নেশার ঘোরে উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মাতাল রা প্রশ্ন করে যায়।তাই তাকে আস্বস্ত করলাম হ্যা করব।সেভাবেই আমাদের রাত কেটে গেল মাঠের মধ্যে।পরের দিন কি ঘটেছিল সেটা কাবাব পার্টির বহির্ভুত বিষয়।আমাদের কাবাব পার্টি সেই রাতেই পূর্ণতা পেয়েছিল।আমরাও পূর্ণ হয়েছিলাম।আমরা কয়েকজন নতুন করে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম।কাবাব খেতে না পারলে কি হবে।কাবাব না খেয়েও কাবাব পার্টি করা যায়।

২৩/০৮/২০১৫, রাজশাহী

মেয়েটা


মেয়েটা একা হেঁটে যাচ্ছেএভাবে কখনও তাকে পাইনি মেয়েটার সাথে কথা বলতে মন আকুপাকু করছেকিভাবে বলবকিভাবে বলতে হয়মেয়েটাও কি আমার সাথে কথা বলবার পায়তারা করছেহয়ত করছে তবে তার বুঝতে বাকি নেই তার পেছন পেছন কেউ তার পায়ের সাথে তাল মিলিয়ে ধীরে হাঁটছেমেয়েটার হাঁটা তাই স্বাভাবিক নয়একটু হেলেদুলেএকটু ধীরেস্বাভাবিকের থেকে একটু নড়বড়ে। কৃষ্ণচূড়া পাতায় বাতাস যেভাবে ঢেউ খেলায়। তার চেয়েও মন্থর। না ভয়ে নয়এখানে ভয় পাওয়ার কথা আসছে কেন?মেয়েটা আমাদের পাশের বাসায় থাকে। আমাকে দুই একদিন দেখেও থাকবে। পরিচিত রাস্তায় পরিচিত মানুষকে কি কখনো কেউ ভয় পায়আবার পরিচিত রাস্তায় পরিচিত মুখও নারী মনে অন্যভাবে আসেনারীদের যেন ভয় পেতে হয়। যেখানে ভয়ের কিছু নাই সেখানেও পেতে হয় যেখানে আছে আরো দ্বীগুন ভয় হয়। ভয় তারা শরীরে লালন করে। সহজাত ভয়। তবে মেয়েটা ভয় পাচ্ছে না। তার পা ফেলানোর মধ্যে দৃঢ়তা দেখেই বোঝা যায়
মেয়েটাকে আমি প্রতিদিন দেখি। সবথেকে বড় কথা মেয়েটাকে আমি প্রতিদিন রাতে দেখি। বারান্দায়। আমার জানালা দিয়ে দেখি। অমাবস্যায় দেখি, চাঁদরাতে দেখি। ভোর রাতে দেখি গভীর রাতেও দেখি। হটাৎ হটাৎ বারান্দায় এসে একটু দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটা আবার চলে যায়। কোনদিকে না তাকিয়ে আনমনে কার দিকে একটু দৃষ্টি স্থির রেখে আবার চলে যায়। অমাবস্যায় তার চোখে আমি জমাট অন্ধকারের গুমোট রাত্রির স্নিগ্ধতা দেখি। পূর্ণিমায় উচ্ছ্বল জ্যোস্নার প্লাবিত করা স্বচ্ছতা দেখিমনে মনে কতবার তাকে প্রেম নিবেদন করেছি। তার হাত ধরে স্তব্ধ শহরে সারারাত ঘুরে ফিরেছিমেয়েটা কি তার কিছু আঁচ করতে পারে। তার খোলা চুলে একদিন জোনাকির আটকে পরা দেখে আমি যে মাতাল হয়েছিলাম সে খবর কি মেয়েটা রাখেএকদিন গ্রীষ্মের মাঝরাতে তার কপালে লেপ্টে থাকা চুলে আমি কি দেখেছিলাম জানিনা। তারপর থেকে আমি কোন লেপ্টে থাকা চুল সইতে পারি না। তার গালে আমি চাঁদের আলোর খেলা দেখেছি। ঝরের রাতে ল্যাম্প পোস্টের আলোয় তার আঁচল উড়তে দেখেছি। মেয়েটাকে আমি কতভাবে দেখেছি কত ভাবে চেয়েছি। কে জানবেতাকে লেখা চিঠি আমি এখনো শেষ করতে পারিনি। প্রতিরাতে সেই চিঠি আমি সম্পন্ন করছি
রাতের অধরা,
 একদিন তোমাকে আমি নদী দেখাতে নিয়ে যাব। নদী মানে জানোনদী হচ্ছে পাহারের কাছে চাওয়া সমুদ্রের ভালবাসা। সমুদ্র একদিন পূর্ণ ছিলনা। সমুদ্র ছিল হাহাকার করা মরুভূমি। আর পাহারের ছিল বুকে জমানো ভালবাসা। সমুদ্র একদিন পাহারের কাছে ভালবাসা চাইল আর অমনি পাহার তার জমানো ভালবাসা সমুদ্র কে দিতে শুরু করল। তাদের এই ভালবাসার সংযোগে তৈরি হল নদী এই ভালবাসা চলবে যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে। ধুৎ কি লিখছি আমিকেটে আবার লিখিরাত গভীর হয়অধরাকে কোন এক ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মেয়েটার সাথে আমার কথা বলা প্রয়োজন। তবে একটা সঙ্কোচ বাধা দিতে থাকে। মনের মধ্যে চাপা দন্দ্ব পথ আটকিয়ে দেয়। হাঁটার গতি স্লথ হয়। একটা পায়ের সাথে আরেক পায়ের দূরত্ব কমে আসে। চারপাশের খুদ্র খুদ্র জিনিস চোখে আটকা পরে। গা ঘামতে থাকে এক সময় মেয়েটা রাস্তা ছেড়ে বাসায় ঢোকেআমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকিঅনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকিআর ভাবি অধরা আমার অধরা

২৩১০১৩, বগুড়া